সাক্ষাৎকার
বেশি জোর দিতে হবে টিকাদান কর্মসূচিতে
প্রকাশ: ২৮ মে ২০২১
আহসান এইচ মনসুর, নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট
সমকাল :করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার বড় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা হাতে নিয়েছে। আগামী অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নে কোন বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত বলে মনে করেন?
আহসান এইচ মনসুর :এডিপির আকার বড় করে সরকার ভালো করেছে। চলমান সংকটের মধ্যে সরকারের ব্যয় বাড়ানো জরুরি। তবে করোনার প্রভাব মোকাবিলার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাড়া নতুন প্রকল্প নেওয়া ঠিক হবে না। একই সঙ্গে করোনার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রকল্প, বিশেষ করে টিকাদান কর্মসূচি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ছাড়া কর্মসৃজন করে এমন শ্রমঘন প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। মেগা প্রকল্প ও মাঝারি গোছের প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, আগামী অর্থবছরে করোনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সব উদ্যোগ থাকতে হবে।
সমকাল :আগামী অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে না। কিন্তু ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাজেট ঘাটতি বাড়বে। তাতে কি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়তে পারে?
আহসান এইচ মনসুর :গত ১০ থেকে ১৫ বছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বা রাজস্ব সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি। জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধির পরিবর্তে কমেছে। আগামী অর্থবছরে করের হার বাড়ানো উচিত হবে না। ফলে মোট রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ার সম্ভাবনা নেই। একদিকে সম্প্রসারণমূলক বাজেট, অন্যদিকে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমছে। এ অবস্থায় ঋণ করতে হবে। তবে বাংলাদেশের জন্য ঋণ সমস্যা নয়। কিন্তু করের হার না বাড়ালেও সরকারের উচিত হবে সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ে।
সমকাল :কোন উৎস থেকে সরকার ঋণ নিতে পারে?
আহসান এইচ মনসুর :বাজেট ঘাটতি ২ শতাংশ বাড়লেও অসুবিধা নেই। এতে ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বাড়বে। এই অর্থ পাওয়া কোনো সমস্যা নয়। কারণ, দেশের ব্যাংকগুলোতে প্রচুর টাকা অলস পড়ে আছে। সরকার চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা ছাপিয়ে নিতে পারে। উন্নত কোনো কোনো দেশ করোনা মোকাবিলায় টাকা ছাপিয়েছে।
সমকাল :রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?
আহসান এইচ মনসুর :রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার। কারণ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিজে নিজেকে পরিবর্তন করবে ভাবলে ভুল হবে। এ পর্যন্ত রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে বা এনবিআরের উন্নয়নে প্রায় অর্ধশত প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এ জন্য সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা রয়েছে। অনেকে করের আওতার বাইরে রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিলেই রাজস্ব বাড়বে।
সমকাল :উন্নয়ন ব্যয়ের সক্ষমতা ও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেক মন্ত্রণালয় বা বিভাগ তাদের বরাদ্দ ব্যয় করতে পারছে না। এ পরিস্থিতির উন্নয়নে করণীয় কী?
আহসান এইচ মনসুর :আসলে রাজস্ব ঘাটতির জন্যই ব্যয় কমিয়ে রাখা হয়। হাতে বেশি অর্থ থাকলে সহজেই বেশি ব্যয় করা যায়। যখন অর্থ সরবরাহে ঘাটতি থাকে, তখন অর্থ মন্ত্রণালয় বিভিন্নভাবে ব্যয় কমিয়ে রাখে। তবে সবক্ষেত্রে এমন হয়, তা নয়। স্বাস্থ্য খাতে এ বছর যা হলো, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিশ্বব্যাংক, এডিবি যন্ত্রপাতি কেনার অর্থ দিয়েছে। শুধু কর পরিশোধ-সংক্রান্ত কারণে সেসব মালমাল মাসের পর মাস বিমানবন্দরের গুদামে পড়ে থাকল। এটা একেবারেই ব্যবস্থাপনার সংকট। করোনার মধ্যে সময়ক্ষেপণের কোনো সুযোগই নেই। সংশ্নিষ্টদের উদ্যোগ ও আন্তরিকতার অভাবে এ ধরনের সমন্বয়হীনতা হচ্ছে। এ সংকট শুধু স্বাস্থ্য বিভাগে তা নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও রয়েছে। সরকারকে ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে জোর দিতে হবে। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। যার যে দায়িত্ব, ঠিকমতো পালন না করলে তার শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ ব্যবস্থার জন্য পদ্ধতিগত উন্নয়ন দরকার। প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে।
সমকাল :অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনে আপনার পরামর্শ কী?
আহসান এইচ মনসুর :সবার আগে দেশের মানুষকে করোনার টিকা দিতে হবে। কমপক্ষে ১০ কোটি মানুষ আগামী অর্থবছরের মধ্যে টিকার আওতায় আনতে হবে। এতে মানুষের জীবন যেমন সুরক্ষিত হবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সচল হবে। এ জন্য টিকাদান কর্মসূচিতে সবচেয়ে জোর দেওয়া দরকার। টিকা পেতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আরও জোরালো করতে হবে। কূটনৈতিক সংযোগ বাড়াতে হবে। যে উৎস থেকে পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই টিকা কিনতে হবে। এই টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। এ জন্য শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর ভরসা করলে হবে না। রাজনৈতিক দল এবং স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এতে হয়তো ছয় মাসের মধ্যে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে টিকা দেওয়া যাবে। চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের জনগণকে টিকা দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ, যত দিন করোনার বিস্তার হতে থাকবে, তত দিন নতুন বিনিয়োগ কম হবে। আর বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থানও বাড়বে না। এ ছাড়া যত দিন অর্থনীতি গতিশীল না হচ্ছে, তত দিন দরিদ্র ও দুস্থ মানুষকে নগদ সহায়তা দিতে হবে। করোনা নিয়ন্ত্রণে আসার পর সামনে এগোনো যাবে।
সমকাল :করের আওতা বাড়াতে আপনার পরামর্শ কী?
আহসান এইচ মনসুর :এটা বাড়বে না। কারণ, দেশের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সমন্বিত তথ্যভান্ডার নেই। তথ্যভান্ডার তৈরি না হওয়া পর্যন্ত কাজটি করা সহজ নয়। মানুষ নিজে এসে কর দেবে ভাবা ঠিক হবে না। একটা পদ্ধতির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। তখন মানুষ কর দেবে। ব্যক্তির কার কী সম্পদ আছে, সন্তানরা কোথায় পড়ালেখা করছে, বাড়ি-গাড়ি আছে কিনা, বেড়াতে যাচ্ছে কোথায় ইত্যাদি তথ্য দরকার। এসব তথ্য থাকলে ১৭ কোটি মানুষের দেশে অবশ্যই করদাতার সংখ্যা বাড়বে। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১৭ থেকে ১৮ শতাংশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এবং নেপাল, ভারত পারলে বাংলাদেশ কেন পারবে না। এ জন্য আগে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও নীতির পরিবর্তন দরকার। যেভাবে চলছে, এভাবে চললে হবে না।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ আবদুল্লাহ